Car Insurance: মানুষের জীবন ও বাড়ির উপর যেমন ইন্স্যুরেন্স হয় তেমনি গাড়ির উপরও ইন্স্যুরেন্স হয়! কার ইন্স্যুরেন্স কী? কেন এই ইন্স্যুরেন্স করা দরকার? কত ধরণের হয় এই ইন্স্যুরেন্স? যাবতীয় তথ্য নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।
কার ইন্স্যুরেন্স কী?
গাড়ি হল মানুষের শখের জিনিস। গাড়ি শুধু কিনলেই হয় না, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করার পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। গাড়ির সাথে যদি কোন দুর্ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি, চুরি বা অন্যের সম্পত্তির ক্ষতির মতো আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়, তখন সেই ঝুঁকি সামলানোর জন্য গাড়ির বিমা করতে হয়।
নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে বিমা সংস্থা গাড়ির সাথে যুক্ত, কিছু নির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতির দায় নিয়ে থাকে। তবে কোন ক্ষতিটিকে বীমার আওতায় ধরা হবে এবং সেক্ষেত্রে কত টাকা পর্যন্ত ক্লিন পাওয়া যাবে! সেই সবকিছু পলিসির ধরন ও শর্তের উপর নির্ভর করে।
Car Insurance কেন করা দরকার?
রাস্তাঘাটে গাড়ি চলতে চলতে অনেক সময় বিপদ-আপদ ঘুরতে পারে। গাড়ির সঙ্গে অন্য কোন গাড়ির ধাক্কা লেগে যেতে পারে বা গাড়ির কোন ক্ষয় ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া অনেক সময় দেখা যায় গাড়ি চুরি হয়ে গেছে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাড়ির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে।
আপনার গাড়ির দ্বারা যদি অন্য কোন গাড়ির ক্ষতি হয়, সেক্ষেত্রেও একটা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন! আপনি, তাই এই সকল ক্ষেত্রে যদি আপনি কার ইন্স্যুরেন্স করে রাখেন তাহলে আর্থিক ক্ষয় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারেন।
3rd Party Motor Insurance
ভারতে এই থার্ড পার্টি মোটর ইন্স্যুরেন্স করে রাখা ভীষণ ভাবে বাধ্যতামূলক। বৈধভাবে রাস্তায় গাড়ি চালাবার জন্য এই কভারটি অবশ্যই থাকা দরকার। এক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে থার্ড পার্টির বিমা করা থাকলে, নিজের গাড়ির ক্ষতি সাধারণত কভার হয় না। এই বিষয়টা যারা জানেন, তারা সাধারণত নিজেদের গাড়ির ইন্স্যুরেন্স করানোর জন্য মোটা টাকার একটি কভার বেছে নেন।
কার ইন্স্যুরেন্স মোট কত ধরনের হয়?
ব্যক্তিগত গাড়ির বীমা কে তিন ভাবে ভাগ করা যায়।
- Third-Party Insurance
- Own Damage Cover
- Comprehensive Insurance
Third-Party Insurance
গাড়ি চালানোর সময় রাস্তায় যদি কোনও দুর্ঘটনা হয়, বা অন্য কোনও ব্যক্তির গাড়ি কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথবা আপনার গাড়ির জন্য কোনও ব্যক্তি আহত হলে, এই পলিসির শর্ত অনুযায়ী থার্ড পার্টি বিমার আওতায় চলে আসবেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, থার্ড পার্টি বিমার ক্ষেত্রে অন্য পক্ষের ক্ষতির দায় কভার করা হয়। বীমা কারীর নিজস্ব গাড়ির ক্ষতির ক্ষেত্রে এটি আওতাভুক্ত নয়।
Own Damage Cover
ওন ড্যামেজ মানেই হল নিজের গাড়ির ক্ষতি হলে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া। এই ক্ষেত্রে গাড়ির দুর্ঘটনা হলে বা গাড়িতে আগুন লাগলে বা কোনোভাবে চুরি হলে-বীমার শর্ত অনুযায়ী গাড়ির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
ওন ড্যামেজ কভার করা হলেই থার্ড পার্টির দায় যে মিটে যায় এমনটা নয়। পলিসির শর্ত অনুযায়ী এই বিষয়গুলো নির্ভর করে।
Comprehensive Insurance
কম্প্রিহেনসিভ পলিসির কভারটা তুলনামূলক ভাবে বেশি। এই সকল ক্ষেত্রে থার্ড পার্টির দায়ের বিষয়টা যেমন কভার হবে তেমনি বীমা কারীর ক্ষতিটা ও কভার হবে।
গাড়ির দুর্ঘটনা, চুরি, আগুন, বন্যা, ঝড় ও ভূমিকম্পের মত ঘটনাতে গাড়ির ক্ষতি হলে পলিসির ক্ষেত্রে ক্লেম করা যেতে পারে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বিভিন্ন অ্যাড অন কভার করা যায়।
Add-on Cover: আসল বীমার সঙ্গে যখন অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধার যোগ হয় তখন সেটাকে অ্যাড অন কভার বলে। এর জন্য অতিরিক্ত একটা প্রিমিয়াম দিতে হয়।
Zero Depreciation Cover: এই ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পরে গাড়ি র কিছু যন্ত্রাংশ বদলানোর সময় ডেপ্রিসিয়েশনের কারণে ক্ষতিপূরণ যাতে কমে না যায় তার জন্য এই কভার করা হয়।
Engine protection cover: কিছু কিছু পরিস্থিতিতে ইঞ্জিনের ক্ষতির জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে এই কভারে।
Roadside Assistance: গাড়ি যদি রাস্তার মধ্যে বিকল হয়ে যায় তাহলে ব্যাটারি থেকে শুরু করে অন্যান্য জরুরী পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই পলিসি কাজে লাগে।
Return to Invoice Cover: গাড়ি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা চুরি হয়ে গেলে বেশ কিছু শর্তে গাড়ি কেনার সময়কার ইনভয়েজ মূল্যের কাছাকাছি অর্থ পাওয়া যেতে পারে কভার অনুযায়ী।
এক্ষেত্রে মনে রাখা ভালো যে, সব অ্যাড অন কিন্তু সকল গাড়িচালকদের জন্য নয়, গাড়ির বয়স ও ব্যবহার অনুযায়ী এগুলি নির্ধারিত হয়।
Insured Declared value: Insured Declared value কে সংক্ষেপে IDV বলা হয়। গাড়ির বর্তমান ভ্যালুয়েশন অনুযায়ী বিমা যোগ্য মূল্যকে বলা হয় IDV। তাই স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির বয়স বৃদ্ধি পেলে Insured Declared value মূল্য কমে যায়।
সহজভাবে বললে, গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যখন সেটা আর মেরামত করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব নয় এই ধরনের ক্ষেত্রে Insured Declared value খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কম প্রিমিয়াম দেখে তাই পলিসি নেওয়া উচিত নয়, পলিসির ক্ষেত্রে Insured Declared value র শর্তগুলি দেখে নেওয়া উচিত।
কার ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম কত দিতে হয়?
কার ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না কারণ এটি সবার জন্য এক অংকের নয়। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এর পরিমাণ কমা বাড়া করে।
কার ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম কীসের ওপর নির্ভর করে?
যে বিষয়গুলির ওপর নির্ভর করে কার ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম, সেগুলি হল-
গাড়ির বয়স, গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষমতা, গাড়ির মডেল ও মূল্য, গাড়িটি কোথায় ব্যবহার করা হয়, আগের বিমার ক্লেম এর ইতিহাস, অ্যাড অন কভার, পলিসির ধরন, গাড়ির IDVও গাড়ির NCB অর্থাৎ নো ক্লেম বোনাস।
তাই একই শহরে এবং একই শহরে থাকা দুজন মানুষ যদি একই ধরনের গাড়ি কেনেন তবুও তাদের বিমার প্রিমিয়াম আলাদা হতে পারে।
NCB বা নো ক্লেম বোনাস কী?
একটি পলিসি বছরে বিমার আওতায় কোন ক্লেম না করলে পরবর্তীতে যখন পলিসি টিকে আবার নবীকরণ করা হয়, তখন NCB বা নো ক্লেম বোনাস পাওয়া যেতে পারে।
তবে এই ক্ষেত্রে গাড়ির ওন ড্যামেজ অংশের প্রিমিয়ামে ছাড় হিসেবে ধরা হয়। এন সি বির নির্দিষ্ট হাড় ও নিয়ম পলিসিস শর্তের ওপর নির্ভর করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একজন মানুষ তার গাড়ি বিক্রি করলেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ncb অন্য গাড়ির পলিসিতে ব্যবহার করা যায়।
কার ইন্স্যুরেন্স করতে কী কী নথি লাগবে?
অনলাইনে কার ইন্স্যুরেন্স করার সময় কতগুলি নথী সাধারণভাবে লাগে।
- গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য
- আগের বীমার তথ্য
- গাড়ির মালিকের প্রয়োজনীয় তথ্য
নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে বীমা সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে পলিসি করা হয়। পলিসি কেনার আগে গাড়ির নাম্বার, মডেল, মালিকের তথ্য ও আগের পলিসির তথ্য সঠিক ভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কী করবেন?
- গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে নিজেকে ও অন্যান্য মানুষদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করুন।
- কেউ যদি আহত হয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
- তারপর বীমা কারীর উচিত তাড়াতাড়ি বীমা সংস্থাকে দুর্ঘটনার কথা জানানো।
- সম্ভব হলে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশে অভিযোগ বা FIR করতে হবে।
যে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেই গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির ছবি, ভিডিও, দুর্ঘটনার স্থান ও প্রয়োজনীয় সকল নথি সংগ্রহ করা উচিত।
বিমা সংস্থার ক্ষেত্রে অনুমোদন বা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অনুসরণ না করে গাড়ি যদি মেরামত করে ফেলা হয় তাহলে কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে। তাই দুর্ঘটনার পর বীমা সংস্থার অনুমোদনের পরই গাড়িতে হাত দেওয়া উচিত বা গাড়ির মেরামতি করা উচিত।
ক্যাশলেস ক্লেম কী?
অনেক বীমা সংস্থা তে ক্যাশলেস ক্লেম করার সুবিধা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নির্দিষ্ট গ্যারেজের ক্যাশলেস পরিষেবার ব্যবস্থা থাকে।
গাড়ি যদি ওই নেটওয়ার্ক গ্যারেজে মেরামত করানো হয় তাহলে পলিসির অন্তর্ভুক্ত খরচের একটা অংশ বীমা সংস্থা গ্যারেজের মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে পারে। তবে যে খরচের উল্লেখ পলিসিতে নেই সেই সকল খরচ কিন্তু বীমা সংস্থা দেবে না, সেগুলো গাড়ির মালিককেই বহন করতে হবে।
যদি কেউ নন নেটওয়ার্ক গ্যারেজে মেরামত করান তাহলে অনেক ক্ষেত্রে আগে নিজের পকেট থেকে টাকা দেওয়া হয় এবং পরে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে তারপর Reimbursement Claim করতে হয়।
কোন কোন ক্ষেত্রে ক্লেম পাবেন না?
কয়েকটি ক্ষেত্রে ক্লেম পাওয়া যায় না, সেগুলি হল-
- যদি আপনি পলিসির শর্ত ভঙ্গ করে থাকেন।
- যদি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স আপনার না থাকে।
- দুর্ঘটনাটা যদি মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর জন্য হয়।
- গাড়ির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ক্ষয় বা মেইনটেন্সের খরচ কে দুর্ঘটনা জনিত বলে কভার করা যাবে না।
বীমা কেনার ক্ষেত্রে শুধু প্রিমিয়াম দেখবেন না, কী কভার করছে এবং কী কভার করছে না দুটোই দেখুন।
কার ইন্স্যুরেন্স করার আগে কী কী দেখবেন?
গাড়ির বীমা কেনার সময় শুধু কমদামের পলিসি বেছে নিলেই হবে না, প্রথমে দেখুন পলিসিতে কী ধরনের কভার রয়েছে। তারপর IDV , Deductible, exclusions , অ্যাড অন কভার, ক্যাশলেস গ্যারেজ নেটওয়ার্ক ও ক্লেম প্রসেস ইত্যাদি বিষয়ে জেনে নিন।
একই সাথে পলিসির রিন্যুয়াল ডেট মাথায় রাখা জরুরি। বিমা শেষ হওয়ার পর গাড়ি চালালে আইনগত ও আর্থিক দু ধরনের সমস্যা হয়।
একটা কথা মনে রাখবেন এই গাড়ির বীমা কিন্তু শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, অনিশ্চিত পরিস্থিতিকে সামলানোর , দুর্ঘটনা জনিত আর্থিক পরিস্থিতিকে সামলানোর একটা সুযোগ। তবে যে কোন বিমার ক্ষেত্রে যেমন ভেবেচিন্তে গ্রহণ করা জরুরী , গাড়ির বিমার ক্ষেত্রেও তাই।
ব্যক্তিগত আয়, গাড়ির বয়স, বাজেট, ভবিষ্যৎ চিন্তা, গাড়িকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে (ব্যবসায়িক কাজে না ব্যক্তিগত কাজে নাকি ক্ষেত্রবিশেষে) এইসব কিছু ভাবনা করে কভার নেওয়া উচিত এবং অবশ্যই কভার নেওয়ার আগে খুঁটিয়ে দেখে নিতে হবে বিভিন্ন শর্ত গুলো।












